মধ্যযুগের ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক শেরশাহ সুরি (শাসনকাল ১৫৪০-১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) মাত্র পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনকালে যে সকল প্রশাসনিক সংস্কার করেছিলেন, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ছিল তাঁর রাজস্ব সংস্কার। এই সংস্কার ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় করা এবং একই সাথে কৃষক বা প্রজাদের স্বার্থ রক্ষা করা। তাঁর প্রবর্তিত ব্যবস্থা পরবর্তী মুঘল প্রশাসন, এমনকি ব্রিটিশ আমলেও অনুসৃত হয়েছে।
শেরশাহের রাজস্ব সংস্কারের প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ভূমি জরিপ ও জমির শ্রেণিবিভাগ
শেরশাহই প্রথম মুসলিম শাসক যিনি সাম্রাজ্যের সমস্ত আবাদি জমি জরিপের (পরিমাপ) এক বৈজ্ঞানিক ও সংগঠিত ব্যবস্থা চালু করেন।
- জরিপ পদ্ধতি: তিনি সিকান্দারি গজ (এক প্রকার মাপার ফিতা) ব্যবহার করে জমি জরিপের নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে জমির সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা হতো।
- জমির শ্রেণিবিভাগ: উর্বরতার ভিত্তিতে জমিকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হতো— ‘উত্তম’, ‘মধ্যম’ ও ‘অধম’। এই তিন শ্রেণির জমির গড় উৎপাদন হিসাব করে রাজস্ব নির্ধারণ করা হতো, যা ‘জাবতি’ (Zabti) প্রথা নামে পরিচিত।
২. রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায়
জমির উৎপাদন ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে একটি ন্যায্য রাজস্ব হার নির্ধারণ করা ছিল শেরশাহের অন্যতম কৃতিত্ব।
- রাজস্বের হার: গড় উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) রাজকর হিসেবে ধার্য করা হয়। কৃষকরা শস্যের মাধ্যমে বা নগদ অর্থে এই কর পরিশোধ করতে পারতেন। তবে সরকার নগদ অর্থ গ্রহণে বেশি আগ্রহী ছিল।
- অতিরিক্ত কর: রাজস্ব ছাড়াও কৃষকদের জরিপের খরচ (জরিমানা) এবং কর আদায়কারীর খরচ (মুহাসসিলানা) হিসেবে মোট করের উপর অতিরিক্ত ২.৫% থেকে ৫% প্রদান করতে হতো।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগে ছাড়: বন্যা, খরা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কৃষকদের রাজস্ব মওকুফ করা হতো এবং প্রয়োজনে государство থেকে কৃষিঋণ (তাকাভি) দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল।
৩. পাট্টা ও কবুলিয়ত প্রথার প্রবর্তন
শেরশাহের রাজস্ব সংস্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল ‘পাট্টা’ ও ‘কবুলিয়ত’ প্রথার প্রচলন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র ও কৃষকের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করেন।
- কবুলিয়ত (Deed of Agreement): এটি ছিল কৃষকের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রকে দেওয়া একটি অঙ্গীকারপত্র। এতে কৃষক তার জমির পরিমাণ, জমির উপর তার স্বত্ব এবং রাষ্ট্রকে প্রদেয় রাজস্বের পরিমাণ উল্লেখ করে সম্মতি জানাত।
- পাট্টা (Deed of Right): এটি ছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কৃষককে দেওয়া একটি দলিল। এই দলিলে কৃষকের নাম, জমির সীমানা, পরিমাণ এবং ধার্যকৃত রাজস্বের পরিমাণ উল্লেখ থাকত। ‘পাট্টা’ প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্র জমিতে কৃষকের স্বত্ব বা অধিকারকে স্বীকৃতি দিত।
এই দুটি দলিলের মাধ্যমে কৃষক যেমন তার অধিকার সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন, তেমনি রাষ্ট্রও তার প্রাপ্য রাজস্ব সম্পর্কে নিশ্চিত থাকত। এটি মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার বা কর্মকর্তাদের শোষণ থেকে কৃষকদের রক্ষা করেছিল।
৪. রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারী
শেরশাহ একটি সুসংগঠিত রাজস্ব বিভাগ গড়ে তোলেন। প্রতিটি পরগণায় (প্রশাসনিক ইউনিট) রাজস্ব আদায়ের জন্য দক্ষ কর্মচারী নিযুক্ত ছিলেন।
- আমিন বা মুন্সিফ: এঁরা ছিলেন বেসামরিক কর্মকর্তা, যাদের প্রধান কাজ ছিল জমি জরিপ করা এবং রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায় করা।
- শিকদার: তিনি ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা, যিনি পরগণার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতেন এবং রাজস্ব আদায়ে আমিনকে সহায়তা করতেন।
- অন্যান্য কর্মচারী: এছাড়াও খাজনা আদায়ের জন্য ফ তহদার (কোষাধ্যক্ষ) এবং কারকুন (হিসাবরক্ষক) থাকতেন।
শেরশাহ এই কর্মচারীদের কার্যকলাপের উপর কঠোর নজর রাখতেন এবং তাদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর বদলির ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হতে না পারে।
উপসংহার
শেরশাহের রাজস্ব সংস্কার ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত, কৃষক-দরদী এবং কার্যকর। এই ব্যবস্থা একদিকে যেমন সাম্রাজ্যের কোষাগারকে শক্তিশালী করেছিল, তেমনই কৃষকদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রদান করেছিল। তাঁর এই সংস্কারগুলো এতটাই সফল ছিল যে, পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবর সামান্য কিছু পরিবর্তন করে এই ব্যবস্থাই গ্রহণ করেন, যা “দহসালা বন্দোবস্ত” নামে পরিচিত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, শেরশাহের এই সংস্কারগুলো কেবল তাঁর সময়ের জন্যই নয়, বরং আধুনিক ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থারও ভিত্তি স্থাপন করেছিল।